ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টার সময় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুতর আশঙ্কা ছিল যে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ দুই নেতাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্বেগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গোপনে তেহরানকে সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছিল। এর আগে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-ও তাদের প্রতিবেদনে একই ধরনের দাবি করেছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, যদি এমনটা ঘটে, তাহলে চলমান শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে এবং সংঘাত আবারও জ্বলে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন যখন সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক সেই সময় মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল যে ইসরায়েল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে নিশানা করতে পারে। এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-কে বলেন, “আপনি যদি এই মানুষগুলিকে হত্যা করেন, তাহলে বাস্তববাদী নেতাদেরই শেষ করে দেবেন।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি এতটাই গুরুতর ছিল যে এ বছরের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্র একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানে বার্তা পাঠায় যে ইসরায়েল এই দুই জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে। এছাড়া, এক কূটনীতিকের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে মার্চ মাসেই মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের ইসরায়েলি সমকক্ষদের অনুরোধ করেছিলেন, যতদিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলবে, ততদিন যেন ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশানা না করা হয়। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-কে বলেন, “রাষ্ট্রপতি চান শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাক।” অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা মতপার্থক্যও সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রথমদিকে দুই দেশই ইরানে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে ছিল, কিন্তু পরে মার্কিন কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো সম্ভবত ক্ষমতায় টিকে থাকবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করানোর দিকেই মনোযোগ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা অ্যারন ডেভিড মিলার ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-কে বলেন, এই ঘটনাপ্রবাহ যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতবিরোধকে স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, এটি আরও ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো আলোচনাকে দুর্বল করে দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইসরায়েলের হাতে ইরানের জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির কথিত হত্যার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এক পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, “আসল মোড় ছিল সর্বোচ্চ নেতার হত্যা নয়, বরং লারিজানির হত্যা। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য একজন ইরানি কর্মকর্তার খোঁজ করছিল, আর হঠাৎ করেই তিনি আর ছিলেন না।”
‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মতে, এরপর আব্বাস আরাঘচি এবং মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এপ্রিল মাসে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং জুন মাসে সংঘাতের অবসানের জন্য একটি বিস্তৃত কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠেন।
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-ও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে যে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করতেন, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল এই দুই নেতাকে নিশানা করতে পারে। সেই কারণেই আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফেরার পথে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সম্ভাব্য ইসরায়েলি হুমকির কথা জানানো হয়। গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর তাঁর বিমান জরুরি ভিত্তিতে মাশহাদে অবতরণ করে এবং পরে তিনি সড়কপথে তেহরানে পৌঁছান।
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শান্তি আলোচনার সময় যদি আব্বাস আরাঘচি বা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যা করা হতো, তাহলে পুরো শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে পারত এবং আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিবেদনগুলোর মতে, ইরান নীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিল, অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।






